ওষুধ কাঁচামাল শিল্পপার্কে কারখানা স্থাপনে চার কারণে অনীহা


editor_post25 প্রকাশের সময় : জুলাই ১৬, ২০২৬, ১:১৮ অপরাহ্ন /
ওষুধ কাঁচামাল শিল্পপার্কে কারখানা স্থাপনে চার কারণে অনীহা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের স্বপ্ন নিয়ে ১৮ বছর আগে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছিল অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্পপার্ক। ২৭ ওষুধ কোম্পানিকে ৯ বছর আগে প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার পরও অধিকাংশ উদ্যোক্তা কারখানা নির্মাণ শুরুই করেননি। চার প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো নির্মাণ করলেও উৎপাদনে গেছে মাত্র দুটি। দুটি প্রতিষ্ঠান আবার তাদের প্লটও বেচে দিয়েছে। ফলে ওষুধের কাঁচামালে আমদানিনির্ভরতা কমানোর যে আশা ছিল, তা ভেস্তে যেতে বসেছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, স্বল্প জায়গা, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংকট– এই চার কারণে শিল্পপার্কে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরকার ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মাধ্যমে গজারিয়ার বাউসিয়ায় ২০০ একর জমিতে এপিআই শিল্পপার্ক করার উদ্যোগ নেয়। পরে ৪২টি প্লট ২৭ ওষুধ কোম্পানিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল, ২০২৪ সালের মধ্যে সব প্রতিষ্ঠান ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে যাবে।

দেশের প্রায় সব বড় ওষুধ কোম্পানিরই সেখানে প্লট আছে। তবে স্কয়ার, বেক্সিমকো, ইনসেপ্টার মতো বড় প্রতিষ্ঠানও সেখানে কারখানা নির্মাণ করেনি। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি শিল্পপার্কের বাইরে নিজস্ব কারখানায় এপিআই উৎপাদন করছে।

গত মঙ্গলবার শিল্পপার্ক ঘুরে দেখা যায়, কোথাও ঝোপঝাড়, কোথাও শুধু সীমানাপ্রাচীর। বরাদ্দ দেওয়া অধিকাংশ প্লট ফাঁকা। দাঁড়িয়ে আছে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা। এগুলো হলো– হেলথকেয়ার কেমিক্যালস, এক্‌মি ল্যাবরেটরিজ, ইউনিমেড ইউনিহেলথ ও ইবনে সিনা। এর মধ্যে হেলথকেয়ার কেমিক্যালস ও এক্‌মি সীমিত পরিসরে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনও করছে। ইউনিমেড ইউনিহেলথ ও ইবনে সিনা উৎপাদনের প্রস্তুতি শেষ করলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি।

ওষুধ শিল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো বছরে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি করে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর কাঁচামাল আমদানির খরচ আরও বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো যায়নি। বর্তমানে বেক্সিমকো, ইনসেপ্টাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি কাঁচামাল  উৎপাদন হলেও এর প্রায় ৯০ শতাংশ নিজস্ব ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

শিল্পপার্কে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এরই মধ্যে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী পরিচালক বরকত আলী বলেন, শিল্পপার্কে সবচেয়ে বড় সমস্যা চারটি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস, অনুমোদন বা ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘসূত্রতা আর স্বল্প জায়গা। তিনি বলেন, কাঁচামাল উৎপাদনে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। তবে এখানে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়, ভোল্টেজও কম থাকে। এতে উৎপাদন খরচ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এখানে উৎপাদিত ৯০ শতাংশ কাঁচামাল আমরা ব্যবহার করি। বাকি ১০ শতাংশ বিক্রি করি।

হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন পাওয়ার পর সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়েছে। তবে কিছু পণ্যের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি পাঁচ মাসেও পাইনি।

এক্‌মি ল্যাবরেটরিজের পরিচালক মতিউর রহমান সিনহা বলেন, প্রায় তিন মাস আগে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছি। নতুন এপিআইর নমুনা অনুমোদনের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।

ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে গত জুনে নমুনা জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন মিললেই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা যাবে। অন্যদিকে ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালক নাজমুল হোসেন বলেন, বর্তমান উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। খরচ কমলে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব।

শিল্পপার্ক সূত্রে জানা গেছে, জায়গা স্বল্পতা ও গ্যাস সংকটের কারণে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং হার্ডসন ফার্মা তাদের প্লট বিক্রি করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ডা. জাকির হোসেন বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করতে না পারায় অধিকাংশ সদস্য শিল্পপার্কে কারখানা করেননি। প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ প্লটের আয়তনকেও পর্যাপ্ত মনে করছে না। তিনি বলেন, এপিআই কারখানায় ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। আবার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার না থাকলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

জানতে চাইলে বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ শিল্পপার্কে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। তবে দেশে গ্যাসের সামগ্রিক সংকট থাকায় দ্রুত সমাধান হবে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বিসিকের দায়িত্ব ছিল উদ্যোক্তাদের প্লট বুঝিয়ে দেওয়া। ইউটিলিটি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থার আওতায়।