রাজউকের কর্মচারী দম্পতির বাড়ি ফ্ল্যাট প্লটসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ!


editor_post25 প্রকাশের সময় : জুন ২৯, ২০২৬, ৯:০৭ অপরাহ্ন /
রাজউকের কর্মচারী দম্পতির বাড়ি ফ্ল্যাট প্লটসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ!

বিশেষ প্রতিনিধিঃ পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় সাধারণ ক্ষতিগ্রস্থ ক্যাটাগরীর ০৩ (তিন) কাঠার একটি প্লটের (আইডি নং-২০-৩০১-০০৪) দখল নিতে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেন জনৈক ফারহানা সিদ্দিকা। আবেদনে ফারহানার স্বামীর নাম মোঃ আনোয়ার হোসেন, ১৬/২, উত্তর-পশ্চিম যাত্রাবাড়ী (১২নং গলি, ৫ম তলা) ঢাকার ঠিকানা লেখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- ফারহানা সিদ্দিকা এবং আনোয়ার হোসেন আসলে কারা, তাদের পেশাগত পরিচয় কি?

জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অর্থ ও নিরীক্ষা শাখায় অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ফারহানা সিদ্দিকা। তার স্বামী মোঃ আনোয়ার হোসেন ওরফে আলম একই প্রতিষ্ঠানের জোন ৮-এ অফিস সহকারী। অথচ রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে ফারহানা-আলম দম্পতি তাদের পেশাগত পরিচয় গোপন করে সু-কৌশলে ক্ষতিগ্রস্থ কোটায় পূর্বাচল প্রকল্পে লোভনীয় ৩ কাঠার একটি প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন!

পরিচয় গোপন করে ক্ষতিগ্রস্থ কোটায় প্লট বাগিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে ফারহানা সিদ্দিকার মোবাইলে (০১৮৩০***৮৮৩) কল দিয়ে জানতে চাইলে তিনি সময়নিউজকে বলেন, আমি প্লটটির বরাদ্দ গ্রহিতা আব্দুল জব্বার মীরের নিযুক্ত আম-মোক্তার। সমুদয় কিস্তি পরিশোধের পর প্লটের দখল বুঝে নিতে নিয়ম অনুযায়ী রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছি। ইতোমধ্যে দখল বুঝে পেয়ে প্লটটি আমার স্বামীর নামে হস্তান্তরও করেছি। এখানেতো কোন সমস্যা দেখছি না। বরাদ্দ গ্রহিতাকে বুঝিয়ে না দিয়ে প্লটটি আপনার স্বামীকে কেন হস্তান্তর করলেন- প্রশ্ন করতেই মোবাইলের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন ফারহানা।

সূত্র মতে, ২০২৩ সালের ১৪ আগষ্ট রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ১২ জনের তালিকা করে তাদেরকে ৩০ আগষ্টের মধ্যে রেকর্ডপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেন দুদকের উপ-পরিচালক জেসমিন আক্তার। ওই তালিকায় ৫ নম্বরে আলম এবং ৬ নম্বরে ফারহানার নাম রয়েছে। তবে পরবর্তিতে দুদক কিংবা রাজউকের পক্ষ হতে আলম-ফারহানার বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, পাশাপাশি ওই তদন্তও আর অলোর মুখ দেখেনি বলে সূত্রের দাবি।

অপরদিকে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন জনৈক মিথিলা ফারজানা। অভিযোগে মিথিলা জানান, “রাজউক এস্টেট-০১ শাখায় কর্মরত এস্টেট পরিদর্শক মুকিদ উল হাফিজ, তন্ময় সরকার নামে জনৈক বহিরাগত ব্যক্তির সাথে যোগসাজশে অবৈধভাবে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছেন। এই তন্ময় সরকার একদা রাজউকের মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে এস্টেট-০১ শাখা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার ব্যবহৃত ল্যাপটপ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করেছিলেন। পরবর্তীতে ‘আর কখনো রাজউকে আসবেন না বা কোনো অবৈধ কাজ করবেন না’ মর্মে ৩০০ (তিনশত) টাকার স্ট্যাম্পে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পান তন্ময়। তন্ময় সরকার পুনরায় এস্টেট-০১ শাখায় সক্রিয় থেকে নিজেকে রাজউকের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এবং প্রতারণা করছেন। এই তন্ময় সরকার জোন ৮-এ কর্মরত বিতর্কিত অফিস সহকারী মোঃ আনোয়ার হোসেনের (আলম) ভাগিনা।”

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ফারহানা-আলম দম্পতি রাজউকে চাকরির আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। মাসে গড়ে ৫০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেই এই দম্পতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, জমি, বাড়িসহ বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছেন। বর্তমানে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ‘৫০ কোটি টাকার অধিক’ এমনটি দাবি করে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনপ্রকার তদন্ত দূরে থাক; ফারহানা-আলমের টিকিটিও স্পর্শ করতে পারেনি কেউ।

সম্প্রতি ফারহানা-আলম দম্পতির দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে আরও একটি অভিযোগ করেন মিথিলা ফারজানা। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে- “আলম তার নির্দিষ্ট কর্মস্থলে (জোন-৮) উপস্থিত না থেকে প্রতিদিন রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে দালালি ও তদবিরে ব্যস্ত থাকেন। হাজিরা খাতায় নিজে স্বাক্ষর না করে নিয়মিত অন্যের মাধ্যমে জাল স্বাক্ষর করিয়ে নেন। শুধু তাই-নয়; আলম নিজ জেলা (সিরাজগঞ্জ) গোপন করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে জামালপুর জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে রাজউকে যোগদান করেছিলেন। আলম ও তার স্ত্রী ফারহানার নামে রাজধানীজুড়ে অঢেল সম্পদ রয়েছে। যার মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে ২১০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ও একটি ৬তলা বাড়ি। উত্তরার উত্তরখান মৌজায় ৪.৭৫ কাঠার একটি প্লট, রানাভোলা মৌজায় ৫ কাঠার প্লটে ৬তলা বাড়ির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একাধিক প্লট। গুলিস্থান মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে দোকান উল্লেখযোগ্য।”

অভিযোগ মতে, “২০১৫ সালে অবৈধ ডলার বহনকালে মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন আলম। এছাড়াও পল্লবী থানায় তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলার (নং ৪৬, তারিখ ১৭/০৮/২০২৫) ১নম্বর আসামি। পূর্বাচলে প্লট দেওয়ার নামে জনৈক আবুল হোসেনের কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা নিয়ে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে বড় ধরনের জালিয়াতি করেছেন আলম। গুলশান এস্টেটের একটি ফাইল গায়েবের ঘটনাতেও আলমের নাম উঠেছিল। গত দুই দশকের অধিক সময় শুধুমাত্র তদবির বাণিজ্য করেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলম তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার মাজনাবাড়ি এলাকায় ছোট ছেলের নামে ‘বাইতুর রাইয়ান নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। মেঝে পাকা টিনসেড ওই মাদ্রাসায় শিশু থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। এলাকার অনেকেই আলমকে রাজউকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলে মনে করেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘আলম স্যার’ নামে পরিচিত। দামী গাড়িতে চলাফেরা, আর্থিক সহায়তা, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অনুদান এবং প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে এলাকায় আলমের বিশেষ পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

নাম পরচয় গোপন রাখার শর্তে স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা জানতাম আলম রাজউকের বড় কর্মকর্তা। পরে জানতে পারলাম তিনি কেরানি পদে চাকরি করেন। তাহলে এত সম্পদ কোথা থেকে এলো? তিনি বলেন, গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিজের ও আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন। এলাকায় কেউ জমি বিক্রি করতে চাইলে আলমের লোকজন আগে খবর পেয়ে যান এবং বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম প্রস্তাব দিয়ে জমি কিনে নেন। মাজনাবাড়ি এলাকায় একাধিক মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয়ের কারণে অনেকে আলমকে ‘দানবীর’ হিসেবেও দেখেন।

ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজউকের এক কর্মচারী জানান, “সামান্য পদের সরকারি দুই চাকর আলম ও ফারহানা। অথচ রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক রোডে এই দম্পতির দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি বাড়ি, উত্তরা ও পূর্বাচলে নামে-বেনামে একাধিক প্লট আছে তাদের। এ ছাড়া আত্মীয়স্বজনের নামেও কোটি কোটি টাকার সম্পদ কিনেছেন তারা। যাত্রাবাড়ীর ওয়াসা রোডের একটি নয়তলা ভবনের বেশির ভাগ ফ্ল্যাটই এই দম্পতির নিয়ন্ত্রণে। তাদের ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়িটি এলাকায় বেশ পরিচিত। রাজউকের একাধিক সূত্রের দাবি, শুধু গাড়ির পেছনেই প্রতি মাসে তাদের ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়, যা তাদের দু’জনের মাসিক বেতনের সমান।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলমের এক সহকর্মী বলেন, “কোন ফাইল কোথায় আছে, কোন প্লটের নথি আটকে আছে কিংবা কার নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে- এসব বিষয়ে আনোয়ারের বিস্তারিত ধারণা আছে। এসব তথ্য ও যোগাযোগকে পুঁজি করেই আনোয়ার-ফারহানা দম্পতি রাজউকে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে আনোয়ার হোসেন আলমের মুঠোফোনে (০১৭১১৩৬***৫) কল দিলে তিনি সময়নিউজকে বলেন, যাত্রাবাড়ীতে একটি ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটি গাড়ি এবং উত্তরায় সাড়ে তিন কাঠার একটি জমি ছাড়া আমাদের আর কিছু নাই। আমরা স্বামী-স্ত্রী রাজউকে দুই যুগেরও বেশি সময় যাবত চাকরি করছি। ২০০৬ সালে জমি এবং ২০১০ সালে ফ্ল্যাটটি কিনেছি। আমাদের ট্যাক্স ফাইলে সবকিছু উল্লেখ করা আছে। রানাভোলা মৌজায় ৫ কাঠার প্লটে ৬ তলা বাড়ি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোন উত্তর না দিয়েই সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। এরপর কয়েকদফা চেষ্টা করেও আলম-ফারহানার সাথে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।