
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পে আসবাবপত্র সরবরাহের নামে কাজ শুরুর আগেই কোটি কোটি টাকা লোপাটের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার (দরপত্র) প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া কিংবা আসবাবপত্র সরবরাহ তো দূরের কথা, কাজ না করেই শত কোটি টাকার বিল তুলে ভাগাভাগির পাঁয়তারা চালাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল হোতা হিসেবে খোদ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাফরিজা শ্যামার নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার হওয়ার আগেই তিনি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নিয়েছেন।
টেন্ডার জালিয়াতি ও ডলারে ঘুষের চাঞ্চল্যকর তথ্য:
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলা হাসপাতালগুলোর আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ৩০০ কোটি টাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে গণপূর্তের কাঠের কারখানা বিভাগ-১ সম্প্রতি তড়িঘড়ি করে ১৫০ কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করে। নিয়ম অনুযায়ী ৩০ জুন অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে ২৩ জুনের মধ্যে পেমেন্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই সুযোগে কাজ শুরুর আগেই পিডি নাফরিজা শ্যামা ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন।
গণপূর্তের কাঠের কারখানা বিভাগে ব্যাপকভাবে প্রচার রয়েছে যে, এই অর্থ বরাদ্দের বিনিময়ে প্রকল্প পরিচালক ৩ শতাংশ হারে কমিশন নিয়েছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নির্বাহী প্রকৌশলী পিডির নাম ভাঙিয়ে দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে এই হারে টাকা তুলেছেন। এমনকি ওই প্রকৌশলী ঠিকাদারদের সাফ জানিয়েছেন, ‘ম্যাডাম’ আমেরিকা সফরে যাবেন, তাই এই কমিশনের টাকা ডলারে পরিশোধ করতে হবে।
ন্যায্য কাজ থেকে বঞ্চিত দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান:
এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতির বলি হয়েছে দেশের অন্যতম নামকরা আসবাবপত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘হাতিল ফার্নিচার’। গত ৮ জুন পর্যন্ত আহ্বান করা মোট ১২টি দরপত্রের মধ্যে ৮টিতেই সর্বনিম্ন দরদাতা (L1) নির্বাচিত হয় হাতিল। কিন্তু গণপূর্তের প্রকৌশলী ত্রয়ের অতিরিক্ত অর্থ বা ঘুষের দাবি মেটাতে অস্বীকৃতি জানানোয় হাতিলকে মাত্র ১টি কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং বাকি ৭টি কাজের আদেশ সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রেজাউল করিম গত ৮ জুন গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রকৌশলী (ই/এম) আশরাফুল হকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। একই সাথে তিনি গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
মন্ত্রীকে ‘ভুল’ বুঝিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা প্রকৌশলীদের:
টেন্ডারে এমন প্রকাশ্য দুর্নীতির খবর পেয়ে গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন বিষয়টি আমলে নেন। তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ইএম-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হককে
সংসদ ভবনে তাঁর কার্যালয়ে তলব করে ব্যাখ্যা চান। তবে কারিগরি জ্ঞান না থাকার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরী মন্ত্রীকে ‘ভুল’ বুঝিয়ে আশ্বস্ত করেন যে টেন্ডারে কোনো অনিয়ম হয়নি। প্রকৌশলীদের এমন চাতুর্যপূর্ণ ব্যাখ্যাতেই মন্ত্রী সন্তুষ্ট হন, অথচ টেন্ডারের পরতে পরতে দুর্নীতির স্পষ্ট ছাপ রয়ে গেছে।
অভিযুক্ত পিডির রহস্যজনক আচরণ:
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক নাফরিজা শ্যামার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে তাঁর বিদেশ সফর শেষ করে আসার কথা স্বীকার করেন। তবে কাজ শুরুর আগেই কেন ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো-জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব না দিয়ে বলেন, “এটা কোনো অনিয়ম না।” এরপর তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিকদের ওপর দায় চাপিয়ে ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে তাঁর মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখেন।
কাজ না করে সরকারি টাকা তুলে নেওয়ার এই প্রকাশ্য অপচেষ্টা এবং দেশের একটি স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করে দুর্নীতির সিন্ডিকেট বজায় রাখার এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও সচেতন মহল। তারা এই হরিলুট থামাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :